কাঁথির কাউন্সিলার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে
এক নজরে হবু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক সফর
নিজস্ব সংবাদদাতা:
কার্যত পূরণ হল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক বৃত্ত। সরকার থেকে বিরোধী আসন, আবার বিরোধী থেকে সরাসরি রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষপদে। পশ্চিমবঙ্গের হবু নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নাম ঘোষণা হয়েছে Suvendu Adhikari-র। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ধারাবাহিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আজ তিনি পৌঁছে গিয়েছেন বাংলার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চে।
ছোটবেলা থেকেই সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ
ছোটবেলায় নিয়মিত রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন শুভেন্দু অধিকারী। মিশনের ভোগ ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দ। পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবা শিশির অধিকারীর আশঙ্কা ছিল— ছেলে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী না হয়ে যান!
স্কুলজীবনে কাঁথিতে সংঘের শাখাতেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতেন তিনি।
ছাত্র রাজনীতি থেকে মূল রাজনীতিতে
আশির দশকের শেষভাগে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে ছাত্র রাজনীতির হাতেখড়ি শুভেন্দুর। কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক সফর।
১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে জিতে প্রথমবার কাউন্সিলর হন তিনি। এরপর ২০০১ সালে মুগবেড়িয়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হলেও তৎকালীন মন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে পরাজিত হন।
পরাজয় থেকে উত্থান
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তমলুকে সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠের কাছে হারতে হয় শুভেন্দুকে। তবে ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবার বিধায়ক হন তিনি।
২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনই হয়ে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে গোটা রাজ্যে পরিচিতি পান অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলে।
তৃণমূলে উত্থান
২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই জয়ের নেপথ্যে বড় ভূমিকা ছিল শুভেন্দুর। একই বছরে Mamata Banerjee যুব তৃণমূলের সভাপতির দায়িত্ব দেন তাঁকে।
২০০৯ সালে তমলুক থেকে জিতে প্রথমবার সাংসদ হন শুভেন্দু অধিকারী। ২০১৪ সালেও একই কেন্দ্র থেকে জয় পান তিনি।
পরবর্তীতে যুব তৃণমূলের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে সৌমিত্র খাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মন্ত্রীত্ব, মতভেদ এবং দলবদল
২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে জিতে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী হন শুভেন্দু। তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একাধিক সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকেও সরানো হয় তাঁকে।
অবশেষে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর মন্ত্রিত্ব ছাড়েন শুভেন্দু অধিকারী। পরে বিধায়ক পদ থেকেও ইস্তফা দেন।
বিজেপিতে যোগদান ও নতুন অধ্যায়
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah-র উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হন তিনি।
২০২৬: বিরোধী দলনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফের একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই কেন্দ্রেই জয় পান তিনি।
এরপর থেকেই বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়। শুক্রবার কলকাতা বিমানবন্দরে অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি রাজনৈতিক মহলে নতুন বার্তা দেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুভেন্দুর নাম ঘোষণা করেন অমিত শাহ।
“বাংলার আশা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠুন”
শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করে অমিত শাহ বলেন,
“শুভেন্দু ভাইকে অনেক শুভেচ্ছা। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠুন। উনি লড়াকু ব্যক্তি, প্রশাসনও দেখেছেন, আবার তৃণমূলের দূষণও দেখেছেন।”
“স্বপ্ন পূরণ করবে বিজেপি সরকার”
নিজের প্রতিক্রিয়ায় হবু মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“ভারতীয় জনতা পার্টির হাজার হাজার কর্মী অত্যাচার সহ্য করেছেন। তাঁদের স্বপ্ন পূরণের কাজ আগামী দিনে বিজেপি সরকার করবে।”
সম্পূর্ণ হল রাজনৈতিক বৃত্ত
কাঁথির এক কাউন্সিলর থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার— শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক সফর যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে শনিবারের শপথগ্রহণের মধ্য

কোন মন্তব্য নেই: